Wednesday, December 8, 2010

৮ই ডিসেম্বর ২০১০

"আমার প্রতিটি শব্দের জন্য আমিই দায়ী"-
এইরকম কোনো মুচলেকা দিয়ে আমি জন্মাই নি।
দলিলে লেখা ছিল-
তোমাদের শব্দই আমাকে ধারণ করবে।
অথচ আমার ফুসফুস যখন ঘামে ভিজে গেছে,
এক মুহুর্ত মুক্তির জন্য দৌড়ে গিয়ে দেখি
কেউ সেই দলিলে সই করে নি।

Friday, September 24, 2010

জ্যাঠামশায় ও শ্রীবিলাস

সন্ধ্যার অন্ধকার ক্রমে গাঢ় হইয়া আসিতেছে। তাঁহার ক্ষুদ্র কামরাটির এক কোণে একটি সেজবাতি জ্বালাইয়া জ্যাঠামশায় পড়িতেছিলেন। এমন সময় দরজার সম্মুখে একটি ছায়ার অনুভব হইল। মুখ তুলিয়া দেখেন শ্রীবিলাস দাঁড়াইয়া আছে। জ্যাঠামশায়ের মুখ স্মিতহাস্যে ভরিয়া উঠিল। হাসিয়া বলিলেন, &হয়ষঢ়;দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে'।



শ্রীবিলাস । অনেকদিন আপনার সাথে দেখা করা হয় নি। আজ নববর্ষের প্রণাম করতে এলাম।

জেঠামশায়। কেন বল তো শ্রীবিলাস? শ্রদ্ধেয়কে প্রণামের প্রথার বিরুদ্ধে আমি আর কিছু বলি না। কিন্তু বাংলা নববর্ষের প্রণাম কেন? বাঙালীর নববর্ষ এখনও কি তোমার কাছে খুব অর্থবহ মনে হয়?

শ্রীবিলাস । অতশত জানি না, কিন্তু আপনাকে প্রণাম আমি করবই।

জেঠামশায়। তা অবশ্যই করবে, হাত খুলে করবে, প্রাণ ভরে করবে।

Sunday, August 22, 2010

তাকে

কে তুমি পদ্মপত্রে মুখ?
কে তুমি আবাল্য অসুখ?
আমার কিছুই মনে পড়ে না
আজ।

কিন্তু ক্কচিৎ প্রখরতার
সঙ্গে মেশা প্রথম আলাপ-
এইরকম কি ছিল?
হেলাফেলা সারাবেলা
প্যামফ্লেট আর পোস্টার মেলা
অঢেল পোর্টিকোতে
পুরোনো সিঁড়িটা, বহু শোধবোধ,
ভাঙা টিটিবোর্ড, বইয়ের গন্ধ,
ট্রামরাস্তাটা বৃষ্টিতে দেখো
নুইয়ে পড়ল-

কে তুমি স্মৃতির মধ্যে জরা?
কে তুমি অকাল স্বয়ম্বরা?

আমার কিছুই মনে পড়ে না
আজ।

এখানে অনেক দেওয়াল,
এবং আলগা আবছায়া,
ধুলোয় ভরা রোদ, অনেক
মানুষ-
একা;
ওদের মাথায় ভর
দিয়েছেন বাদশাহী ঈশ্বর,
সেই পবিত্র হারেমে
এক বালিকা দেন দেখা।

কে তুমি উন্মাদিনী রাই?
কে তোমার নির্বাসনের সাঁই?
আমার কিছুই মনে পড়ে না
আজ।

(বাংলালাইভ শারদীয়া ১৪১৫)

Wednesday, August 18, 2010

ন্যাকারবোকার পদ্য

একা ন্যাকা খাচ্ছিল শাঁক আলু সেদ্ধ,
 তার সাথে দু পাঁইট ছিল যে বরাদ্দ।
  হেনকালে বোকা এসে বলে ন্যাকা ভাই রে,
  তোর আছে লাইসেন, মোর কিছু নাই রে।
  ন্যাকা বলে, "শোন তবে কুমড়োর ছেঁচকি,
  ফার্স্ট তোকে হতে হবে মোর মত সেস্কি।
  দুই ফোঁটা এন জি ও, পাঁচ ফোঁটা কর্পো,
  কানে গুঁজে মহা রেলা  জনসম্পক্কো।
  এক হাতে দাড়িদা বা দেরিদার বাইবেল,
   আর হাতে মোবাইল, বাকার্ডির মাইফেল"।

Monday, August 9, 2010

ভাষাবন্ধন জুলাই সংখ্যা


দেশভাগ্ সম্পর্কিত কয়েকটি বই
বৈজয়ন্ত চক্রবর্তী

হাসান আজিজুল হক; আগুনপাখি (কলকাতা: দে' পাবলিশি, প্রথম প্রকাশ: কলকাতা, ২০০৮);
ত্রিদিব চক্রবর্তী, নিরুপমা রায় মন্ডল, পৌলোমী ঘোষাল সম্পা: ধ্বংস নির্মাণ: বঙ্গীয় উদ্বাস্তু সমাজের স্বকথিত বিবরণ (কলকাতা: সেরিবান, স্কুল অব কালচারাল টেক্সট্স্ অ্যান্ড রেকর্ডস্, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, প্রথম প্রকাশ: কলকাতা, ২০০৭)
সেমন্তী ঘোষ সম্পা: দেশভাগ: স্মৃতি আর স্তব্ধতা (কলকাতা: গাঙচিল, প্রথম প্রকাশঃ কলকাতা, ২০০৮)

"আমাকে কেউ বোঝাইতে পারলে না যি সেই দ্যাশটো আমি মোসলমান বলেই আমার দ্যাশ আর এই দ্যাশটি আমার লয়৷ আমাকে আরও বোঝাইতে পারলে না যি ছেলেমেয়ে আর যায়গায় গেয়েছে বলে আমাকেও সিখানে যেতে হবে৷ আমার সোয়ামি গেলে আমি আর কি করব? আমি আর আমার সোয়ামি তো একটি মানুষ লয়, আলেদা মানুষ৷ খুবই আপন মানুষ, জানের মানুষ, কিন্তুক আলেদা মানুষ"-আগুনপাখি, হাসান আজিজুল হক
 
দেজ পাবলিশিং প্রকাশিত উপন্যাসটির পিছনের প্রচ্ছদে এই কয়টি লাইন উদ্ধৃত৷ লাইনগুলি উপন্যাসটির মূল মোটিফের সার্থক ধরতাই যোগায়৷ হাসান আজিজুল হকের মত শক্তিশালী কাহিনীকারের প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস হিসেবে "আগুনপাখি" অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ৷ অনেকের কাছে হয়ত বা আনন্দ পুরস্কার প্রাপ্তি উপন্যাসটিকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দান করে৷ কিন্তু আপাতত: আমি লাইন কটির পিছনে একটি উপমহাদেশ এবং তার অগুন্তি সাধারণ মানুষের ইতিহাসের সিল্যুয়েট ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাই না৷হয় তো আরও অনেক কিছুই দেখা সম্ভব৷ একজন মুসলমান নারীর গার্হস্থ্য আত্মকথন চলতি যুগের অ্যাকাডেমিক ফ্যাশনের নিরিখে বহুমাত্রিক বিশ্লেষণের সম্ভাবনায় উজ্জ্বল৷ উপন্যাসটির সরলরৈখিক আটপৌরে চলন কি ইচ্ছাকৃত একটি শৈলী, যা দেশভাগের বিয়োগান্ত মহাকাব্যের একটি সমান্তরাল নারীবাদী ভাষ্যের জন্ম দেয়? অথবা, বন্যা মন্বন্তরের পরে যৌথ পরিবারের ভাঙন কি পরবর্তী সময়ের আরও বড় ভাঙনের রূপকাভাস? প্রশ্নগুলি এই মুহূর্তে আমি এড়াতে চাই৷ বস্তুত: উপন্যাসটির প্রথাগত সমালোচনা আদৌ লেখাটির উদ্দেশ্য নয়৷ হাসান আজিজুল হলের মত প্রবাদপ্রতিম কাহিনীকারের সৃষ্টির ভালোমন্দ বিচারের স্পর্ধা বা সামর্থ্য -কোনোটাই অর্জন করি নি এখনও৷ উপন্যাসটির গপ্পোটি জেনে নেওয়ার দায়িত্বটাও পাঠকপাঠিকার উপরই ন্যস্ত করি৷ বরং কম্পাসপ্রতিম বাক্যগুলি বুকপকেটে রেখে কিছু এলোমেলো ভাবনার রাস্তায় বেরিয়ে পড়ি৷

Thursday, July 15, 2010

ভালোবাসা বিষয়ক



হারিয়ে যাওয়া দরজা
এবং ফুরিয়ে যাওয়া স্বর,
তার মধ্যে বসত করেন
নাচার লখিন্দর।

নয় দরোজায় রাতপাহারা
শুনশান আশমান,
নদীর বুকে বাঁধ, কিন্তু
পাশেই গোরস্থান।

গোরস্থানের আতরগন্ধ
মাথায় করেন ভর,
কাফন থেকে লুকোচুরি
খেলেন লখিন্দর।

সাড়ে তিনহাত গাছের হাওয়ায়
নিভছে হারিকেন,
পড়ছি নিজের জানাজা
তাও তিলপরিমাণ প্রেম।



গড়িয়া থেকে মাঠপুকুরের তিৎকুটে এক ভিড়
বাক্সোবাসের করুণ কোণে চোখের মাথা খেয়ে
ঘাড় ঘোরাতেই অবাক আলোয় পড়ল ধরা
অনাঘ্রাত তিল;
ঢাকল মৌটুসি মোবাইল।



ভালোবাসা পেলে আমি মোটেও লণ্ডভণ্ড যাব না,
জবুথুবু আলাভালা বসে থাকব ছড়ানো রোদ্দুরে।
বস্তুতঃ সেরকম ভালোবাসা পেলে কেই বা বেঁচে থাকে?
মরে যায় পুনর্জন্মে ভালবাসা ফিরে পাবে বলে।



চুমু তোমার ভ্রণে
যখন লুকোনো আশ্বিনে
বাউল এবং দেবী
আঁকেন শরীরজোড়া ছবি;
কাঁপে তীব্র রেখাব স্বর,
গড়ি ঘরের মধ্যে ঘর।



পাঁচ মানুষের ভিড়,
গৃহস্থ অস্থির।
চার মানুষের মাথা,
কথার পিঠে কথা।
তিন মানুষের বংশ,
সৃষ্টি পালন ধ্বংস।
দুই মানুষের ঘর,
কোথায় অবসর?
একটি মানুষ একা,
ঈশ্বরী দেন দেখা।

(বাংলালাইভ বৈশাখী আই-পত্রিকা ১৪১৬)

হিসেব

যতটা থাকে ততটাই যায়,
তার বেশি তো যায় না;
তবুও সারা সকালসন্ধে
মুখের সামনে আয়না।

আয়না যেন ঘরের আড়াল
আটকে রাখে হাওয়া,
আয়না বড় লক্ষ্মীমন্ত
যখন যেমন চাওয়া।

যেভাবে হবার সেভাবেই হয়
অন্যভাবে হয় না;
যতই লুকাও শমীবৃক্ষে
অস্ত্র এবং গয়না।

(বাংলালাইভ শারদীয় আই-পত্রিকা ১৪১৬)